কি যোগ্যতায় নিয়োগ পেলেন বিমানের এমডি?

November 11, 2019 12:11 pm
Print Friendly, PDF & Email

 

বিশেষ সংবাদদাতা:

রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পদের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রয়োজনীয় যোগ্য না থাকার পরও প্রতিষ্ঠানটির এমডি ও সিইও পদে অতিরিক্ত সচিব মো. মোকাব্বির হোসেন-কে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১৪ মার্চ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এমডি ও সিইও পদে প্রার্থী চেয়ে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞপ্তি দেয় হয়। এ বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীর এভিয়েশন খাতে নূন্যতম ২০ বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। যার মধ্যে ১০ বছর বিমানের ব্যবস্থাপনার উচ্চপদে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকার শর্তজুড়ে দেয়া হয়।

এ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আরও শর্ত রাখা হয়, প্রার্থীর বয়স হতে হবে ৪৫ থেকে ৬০ বছর। থাকতে হবে অ্যাভিয়েশন আইন ও শ্রম আইন সম্পর্কে ধারনা। সেই সঙ্গে অন্যান্য এয়ারলাইন্স কোম্পানি সঙ্গে যে কোনো ধরনের ডিলিংকসের সক্ষমতা থাকতে হবে।

বিমান বাংলাদেশের এই বিজ্ঞপ্তিতে সাড়া দিয়ে এমডি ও সিইও পদে ৭০ প্রার্থী আবেদন করেন। এর মধ্যে বিদেশি প্রার্থী ছিল ১২ জন। তবে সবার যোগ্যতাকে ছাপিয়ে গত ১২ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশে এয়ারলাইনসের এমডি ও সিইও পদে নিয়োগ পান অতিরিক্ত সচিব মো. মোকাব্বির হোসেন।

তবে অভিযোগ উঠেছে এভিয়েশন খাতে মোকাব্বির হোসেনের ২০ বছরের অভিজ্ঞতা নেই। ১৯৯১ সালে বিসিএস প্রশাসনে যোগদান করা মোকাব্বির ২৯ মে ২০১৮ থেকে গত ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১৬ মাস বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব (বিমান ও সিভিল এভিয়েশন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। চাকরি জীবনের বাকি অংশ তিনি যুগ্ম সচিব হিসেবে জনপ্রশাসন, অর্থ বিভাগ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেন।

এ বিষয়ে বিমানের সাবেক পরিচালনা পর্ষদ সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম এশিয়ান মেইলকে বলেন,
বিমানে এখন প্রফেশনালিজম বলতে কিছু নেই।
এয়ারলাইন্স ব্যবসায় প্রফেশনালিজম খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিমান ম্যানেজমেন্টে যদিও সে প্রেকটিস নেই। ফলে নতুন নতুন মডেলের অত্যাধুনিক এয়ারক্রাফট এনেও বিদেশী এয়ারলাইন্সের সঙ্গে কম্পিটিশনে আসতে পারছে না রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটি। সিইও পদে প্রফেশনাল না বসাতে পারলে বিমানকে আরো মাসুল গুনতে হবে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, এমডি ও সিইও নিয়োগের বিষয়ে অতীতের বিজ্ঞপ্তিগুলোতে যে অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল তা বর্তমান এমডির নেই। এয়ারলাইনসের উচ্চ পদে তার চাকরীর অভিজ্ঞতা নেই। শুধু ১৬ মাস বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বাকি সময় জনপ্রশাসন, অর্থ বিভাগ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব কিছুতেই এভিয়েশন খাতের অভিজ্ঞতা হিসেবে গণ্য হতে পারে না।

যদিও মোকাব্বিরকে এমডি ও সিইও হিসেবে নিয়োগ দেয়ার সময় বিমানের পরিচালনা পর্ষদ সদস্য ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মহিবুল হক বলেছেন, বিমান বোর্ড এমডি নিয়োগের জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। কিন্তু আবেদনকারি দেশি-বিদেশি কাউকেই এ পদের যোগ্য হিসেবে পাওয়া যায়নি। এ জন্য বিমান বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুসারে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিমানের এমডি পদে অতিরিক্ত সচিব মো. মোকাব্বির হোসেনকে নিয়োগের আাদেশ দিয়েছে।

মোকাব্বির হোসেনের নিয়োগের ব্যাপারে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী বলেন, মার্চ মাসে দেওয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী মোকাব্বির হোসেনকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। যেহেতু আবেদনকারিদের এমডি পদের জন্য যোগ্য মনে করা হয়নি, তাই বিমানকে সুন্দর ভাবে চালানোর জন্য মন্ত্রণালয় থেকে অতিরিক্ত সচিব মোকাব্বির হোসেনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

আর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ও সাবেক এয়ার মার্শাল ইনামুল বারী বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সরকারের একটি কোম্পানি। এর ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব সরকারের। এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে চাহিদামত যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থী পাওয়া যায়নি। যে কারণে বিকল্প হিসাবে মন্ত্রণালয়ের একজন অভিজ্ঞ অতিরিক্ত সচিবকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তাকে কিছুদিন সময় দেওয়া উচিত। আমরা আশা করছি তিনি বিমানের জন্য ভালো কিছু করতে পারবেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এর আগে বিমান বাংলাদেশের এমডির অভিজ্ঞতা নিয়ে আর কখনো প্রশ্ন উঠেনি। ২০১৩ সালের মার্চে প্রতিষ্ঠানিটির এমডি ও সিইও হিসেবে যোগ দেন কেভিন জন স্টিল। এভিয়েশন খাতে তার ৩০ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা ছিল। বিমানে যোগ দেয়ার আগে কেভিন জন স্টিল ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের বৈদেশিক ষ্টেশনসমুহ-সিংগাপুর, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, পাকিস্তান এবং সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন।

এরপর তিনি ইতিহাদ এয়ারওয়েজের বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের প্রধান হিসেবে স্লট বর্ধিতকরণ, চ্যানেল ম্যানেজম্যান্ট এবং গ্রাহকসেবা উন্নয়নে ভূমিকা পালন করেন। ২০০৭ সালে কেভিন সৌদি আরবের এলসিসি এয়ারলাইন্সের পরিচালক বিক্রয় এবং পরবর্তীতে প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা হিসেবে রাজস্ব ব্যবস্থা, নেটওয়ার্ক উন্নয়নসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ২০১০ সালে কেভিন এরিক এয়ার-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (বাণিজ্য) হন।

যুক্তরাজ্যের ল্যাঙ্কেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএসহ স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করা কেভিন হঠাৎ করে অসুস্থতার কারণে বিমানের এমডির পদ ছেড়ে দেন। এরপর ২০১৪ সালের ৯ এপ্রিল আবারও এমডি ও সিইও পদে প্রার্থী চেয়ে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞপ্তি দেয় বিমান। এতে প্রার্থীর প্রাথমিক যোগ্যতা হিসেবে বলা হয়— প্রার্থীর বয়স হতে হবে ৪৫ থেকে ৬০ বছর। আগ্রহী প্রার্থীর এভিয়েশন পেশায় অন্তত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এর মধ্যে জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপনায় অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকাতে হবে। এছাড়া এয়ারলাইনস ব্যবসায় বিপণন, কোড শেয়ার, নতুন অন-লাইন প্রযুক্তিতে পারদর্শীতা, এভিয়েশন ও শ্রম আইন সম্পর্কে জ্ঞান থাকার পাশাপাশি আরও কিছু শর্ত জুড়ে দেয়া হয়।

এর প্রেক্ষেতে বিমান বালাদেশ এয়ারলাইনসের এমডি ও সিইও হিসেবে নিয়োগ পান কাইল হেউড। তবে ২০১৫ সালের অক্টোবরে এমডি ও সিইও হিসেবে কাইল হেউড’র চাকরির মেয়াদ না বাড়ানোর সুপারিশ করে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। যার প্রেক্ষিতে কাইল হেউড’র মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ২০১৫ সালের ২৩ নভেম্বর এমডি ও সিইও পদে প্রার্থী চেয়ে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞপ্তি দেয় বিমান।

ওই বিজ্ঞপ্তিতেও প্রার্থীর প্রাথমিক যোগ্যতা হিসেবে বলা হয়— প্রার্থীর বয়স হতে হবে ৪৫ থেকে ৬০ বছর। আগ্রহী প্রার্থীর এভিয়েশন পেশায় অন্তত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এর মধ্যে জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপনায় অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা চাই। এছাড়া এয়ারলাইনস ব্যবসায় বিপণন, কোড শেয়ার, নতুন অন-লাইন প্রযুক্তিতে পারদর্শীতা, এভিয়েশন ও শ্রম আইন সম্পর্কে জ্ঞান থাকার শর্ত জুড়ে দেয়া হয়।

এর প্রেক্ষিতে ২০১৫ সালে পরিচালক পদ থেকে অবসারে যাওয়া মোসাদ্দিক আহমেদ বিমানের এমডি হিসেবে নিয়োগ পান ২০১৬ সালে। তবে পরিচালক থাকা অবস্থাতেই তিনি বিমান বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী পদে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮৩ সালে বিমানের সহকারি ম্যানেজার পদে কাজ শুরু করা মোসাদ্দিক মার্কেটিং, কাস্টমার সার্ভিস, প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ও ফাইন্যান্স বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন। অবসরে যাওয়ার পর মোসাদ্দিক আহমেদকে ২০১৬ সালের ১ জুন বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও হিসেবে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। পরবর্তীতে চুক্তির মেয়ার শেষ হলে ফের তাকে বিমানের এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।