বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে সোনার তরী

November 30, 2019 12:54 pm
Print Friendly, PDF & Email

 

বিশেষ সংবাদদাতা

বিমানের সর্বশেষ কেনা ড্রিমলাইনার ৭৮৭-৯ সোনার তরী এখনো ঢাকায় আসেনি। এটি আসছে ২০ ডিসেম্বর। তার আগেই বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে এই সোনার তরী। সিয়াটল থেকে সরাসরি দুবাইয়ে উড়ে আসা সোনার তরী অংশ নেয় সদ্য সমাপ্ত এয়ার শোতে। যেখানে উপস্থিত ছিলেন গোটা বিশ্বের বিমানবাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তা ও এয়ারলাইন্সের নির্বাহীগণ। বিশেষভাবে আমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিমান প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী, বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ারমার্শাল মসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত ও সচিব মহিবুল হকসহ বেবিচকের অন্যান্য কর্মকর্তা। মূলত এটি সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন মডেলের যুদ্ধবিমানের প্রদশর্নী হলেও এখানে ঠাঁই পায় বাংলাদেশ বিমানের জন্য সদ্য কেনা দুটো ড্রিমলাইনারের একটি। গত ১৭ নবেম্বর থেকে ২১ নবেম্বর অনুষ্ঠিত এই এয়ারশো আলোকিত করেছে সোনার তরী। যা এখন ঢাকায় পাঠানোর জন্য বর্ণিল সাজে সাজানো হচ্ছে বোয়িং কোম্পানির সদর দফতর শিয়াটলে।

এয়ারশো থেকে ফিরে প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী জানান, সোনার তরীর উড়ন্ত কলাকৌশল দেখে বিস্মিত হয়েছেন এভিয়েশন বিশ্বের উদ্যোক্তারা। তারা দেখেছেন, ফাইটার জেটের মতো কিভাবে বেসামরিক উড়োজাহাজ চালানো সম্ভব। মার্কিন মুল্লুকের অন্যতম সেরা এক পাইলট যুদ্ধবিমানের মতোই বিভিন্ন এ্যারাবিক স্টাইলে প্রদর্শন করেন সোনার তরীর ক্লাসিক ফ্লাইং। যা দেখে বিমোহিত হয়েছেন দুনিয়ার শীর্ষ সামরিক বেসামরিক উড়োজাহাজ নির্মাতা কোম্পানির প্রতিনিধিরা। জানা গেছে, দুবাই এয়ার শোতে বিমানের ড্রিমলাইনারটিই সবার নজর কেড়েছে। এয়ার শোতে বিপুলসংখ্যক যুদ্ধ বিমান মধ্যে মাত্র দুটো বেসামরিক উড়োজাহাজ ঠাঁই পায়। এর একটি বাংলাদেশ বিমানের সোনার তরী ও অন্য একটি এয়ারলাইন্সের একটি এয়ারবাস। এর মধ্যে সোনার তরীর উড্ডয়ন কৌশল দেখে সবাই বিমোহিত হয়েছেন।

এ সম্পর্কে বিমান প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী জানান, ড্রিমলাইনারটি যে কৌশলে ফ্লাইং ডিসপ্লে করেছে তা একমাত্র ফাইটার উড়োজাহাজের পক্ষেই সম্ভব। উড়তে উড়তে হঠাৎ সেটা ৯০ ডিগ্রী এ্যাঙ্গেলে কার্ব করে, আবার সেটা ০ ডিগ্রীতে ফিরে আসা সত্যিই রোমাঞ্চকর। বোয়িং কোম্পানির হাতেগোনা ক’জন সুদক্ষ বৈমানিকের অন্যতম জেমস এই ড্রিমলাইনারটি স্টাইলিশ এ্যারোবিক্সে ফ্লাই করেন। এ বিষয়ে পরে ওই পাইলটের সঙ্গে ড্রিমলাইনারে ভেতরের খুঁটিনাটি দেখার সময় জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, ড্রিমলাইনার ৭৮৭-৯ সিরিজটিই সর্বশেষ সংস্করণ। এতে এমন কিছু অপশন আছে-যেটা অন্য কোন উড়োজাহাজে নেই। টানা ১৯ ঘণ্টার ফ্লাই করতে সক্ষম। এই ড্রিমলাইনারের সামনের ও পেছনের দিকে ছাদ ঘেঁষে রয়েছে ককপিট ও কেবিন ক্রুদের জন্য বিশ্রামের বিশেষ কেবিন। এ ধরনের ফ্লাইটের সাধারণত দুই সেটা করে ককপিট ও কেবিন লাগে।

টেস্ট ফ্লাইংয়ের সম্পর্কে জানতে চাইলে এয়ার শোতে অংশ নেয়া বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বলেন, এ ধরনের ফ্লাইংকে বলা হয় অপটিমাম পারফর্মেন্স ম্যানুভার। হেভিম্যানুভার সব সময়ই মনোমুদ্ধকর। গ্রাউন্ডে বসে থাকা হাজার হাজার দর্শকের সামনে অত্যন্ত নিচ দিয়ে এ ধরনের হেডিম্যানুভার করাটার পাইলটের যেমন দক্ষতা প্রসংশিত হয়েছে তেমনি এটি বাংলাদেশ বিমানের উড়োজাহাজ ঘোষণা দেয়ায় আমরা সবাই গৌরবমন্ডিত হয়েছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ ও অনুমোদনেই এটিকে শিয়াটল থেকে আনা হয় বিশেষ ব্যবস্থায় বিশেষ প্রদর্শনীর জন্য।

এই ড্রিমলাইনারের রেঞ্জ সম্পর্কে এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বলেন, বিমানের ৭৮৭-৯ উড়োজাহাজে তিন শ্রেণীর স্ট্যান্ডার্ড কনফিগারেশনে ২৯৮ জন যাত্রী বহনসহ একটানা ৭৫৩০ নটিক্যাল মাইল উড়তে পারে অর্থাৎ টানা উনিশ ঘণ্টা উড্ডয়ন ক্ষমতা রয়েছে। অন্যান্য উড়োজাহাজের তুলনায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি খরচ এবং নির্গমণ হ্রাস করতে পারে। এই দুটো ড্রিমলাইনার দিয়ে নিউইয়র্ক ও মন্ট্রিয়ল রুটের মতো লং ফ্লাইট করা উপযোগী। যাত্রী ও ক্রুরাও বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করার মতো যথেষ্ট এন্টারটেইমেন্ট সুবিধাদি রয়েছে।

বিমান জানিয়েছেন সোনার তরী ও অচিন পাখি দিয়ে আগামী ৫ জানুয়ারি থেকে দুটি ইউরোপীয় গন্তব্য ম্যানচেস্টার এবং হিথ্রোর রটে ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে। দুটি ড্রিমলাইনারের লগো ও রং করার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দেশে আনার আগে সোনার তরী কয়েক দফা পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের পর দুবাইয়ে সবচেয়ে বড় ফ্লাইং টেস্ট করে।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং কোম্পানির সঙ্গে ১০টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে বিমান। এর মধ্যে ৪টি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর, ২টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ ও ৪টি ড্রিমলাইনার ৭৮৭-৮। এ ১০টি বোয়িংয়ের নামকরণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার মধ্যে চারটি ড্রিমলাইনারের নাম হচ্ছে-আকাশবীণা, হংসবলাকা, গাঙচিল ও রাজহংস। বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর-এর নামকরণ করা হয়েছে পালকি, অরুণ আলো, আকাশ প্রদীপ ও রাঙা প্রভাত। মেঘদূত ও ময়ূরপঙ্খী নাম রাখা হয়েছে দুটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এর। এসবগুলো নিয়ে এখন বিমানবহর অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। এর মধ্যে নিজস্ব উড়োজাহাজের সংখ্যা হচ্ছে ১২টি, লিজের ৬টি। আগামী মার্চে যোগ হবে নিজের আরও তিনটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ। তখন চলে যাবে লিজের ২টি ড্যাশ-৮ । সে পরিস্থিতিতে মোট বহরে থাকবে ১৭টি উড়োজাহাজ।