গণতন্ত্র দুর্বল বলেই স্বাধীন সাংবাদিকতা অস্তিত্ত্ব সংকটে

February 10, 2021 9:44 pm
Print Friendly, PDF & Email

শফিকুল ইসলাম জুয়েল:

এক গ্রামে এক লোক উচিত কথা বা অপ্রিয় সত্য কথা বলতেন। তজ্জন্যে তার সুনাম বা বদনাম আশপাশের গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে। একদিন তার নিজের চাচী আক্ষেপ করে বলেন, বাবারে, সবার মুখে তোর উচিত কথা বলা নিয়ে কত প্রশংসা শুনি। অথচ কোনো দিন এই তোর চাচীকে নিয়ে কিচ্ছু বলিসনি।

চাচির এই আক্ষেপে ভাতিজা বলে, চাচী, তুমি আমার উচিত কথা সহ্য করতে পারবে না। চাচিও নাছোড়বান্দা, যে করেই হোক- আজ উচিত কথা শুনবেনই। ভাতিজা মহাবিপদে।

চাচির তাগাদায় বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘চাচী- চাচা মারা গেছেন সেই কবে। তারপর থেকেই দেখে আসছি, লতু চাচা আমাদের বাড়ি এলেই তুমি কেমন যেন হয়ে যাও। তখন তোমার সাজগোজ ও খুুশির ভাবটি বেড়ে যায়…।’ এটুকু শুনেই চাচী গালি দিয়ে বলেন, গোলামের পুত গোলাম। বন্ধ কর তোর উচিত কথা। হায় হায়! একি….।

সমালোচনাসহিষ্ণু বাংলাদেশের এ সরকার- এই চাচীরই মতো। এক দিকে সাংবাদিকদের সরকারের তল্পিবাহক না হয়ে সমালোচনার পরামর্শ দেন; অন্যদিকে ‘উচিত কথা’ বলার কারনে জীবন ধ্বংস করতে একটু কার্পণ্যও করেন না।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা প্যারিসভিত্তিক সংগঠন “রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস” এর তথ্য অনুসারে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বৈশ্বিক সূচকে ১৮০ টি দেশের মধ্যে ২০১৭ সালেও বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৬, ২০১৮ তে ১৫০। আর ২০২০ আরো একধাপ পিছিয়ে ১৫১ তম । অথচ ২০০৯ সালে মুক্ত গণমাধ্যম ইনডেক্সে বাংলাদেশ ছিল ১২১তম।

বিস্ময়কর হল- প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে। এমনকি অঘোষিত সেনাশাসনে থাকা মিয়ানমারের চেয়েও (১৩৯)। তালিকায় ভারতের অবস্থান ১৪২, পাকিস্তান ১৪৫, শ্রীলঙ্কা ১২৭, নেপাল ১১২ এবং আফগানিস্তান ১২২।

বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যম অনেক দিন ধরেই প্রচন্ড চাপের মধ্যে আছে। গণমাধ্যমগুলো নিজেরাই সেন্সরশিপ করতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ- কড়া মনিটরিং, ভয়ভীতি, প্রশাসনিক চাপ, বিজ্ঞাপনদাতাদের ব্যবহার করে অর্থনৈতিক চাপে রাখার অপচেষ্টাসহ নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে।

অন্যদিকে কতিপয় সাংবাদিক নেতা ও বড় একটি অংশ যখন রাজনীতিক-নেতা-মন্ত্রী-আমলা, সরকারে ঘনিষ্ঠজনে পরিণত হন, তখন সাংবাদিকতার খুব বেশি কিছু অবশিষ্ট থাকে না। কারণ, তখন ক্ষমতাসীনরা পরিকল্পিতভাবেই তাদের বিরুদ্ধ মতবাদকারিদের শায়েস্তা করতে পারে। তখন যারা সাংবাদিকতা করতে চান, তাদের পরিণতি হয় শ্রদ্ধেয় সম্পাদক আবুল আসাদ, সিনিয়র সাংবাদিক রুহুল আমিন গাজী, শফিকুল ইসলাম কাজল বা আরিফুল ইসলামদের মতো।

সত্য সংবাদ প্রকাশ করলেই সরকারের রোষাণলে পড়তে হচ্ছে। বিভিন্ন নাটক সাজিয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করাসহ সত্য প্রকাশে বাধা দেয়া হচ্ছে। হত্যা, খুন, গুম ও নির্যাতন করে সাংবাদিকদের আতংকগ্রস্থ রাখা হচ্ছে। কেননা অন্যায় অপকর্মের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের কলম গর্জে উঠলে সরকারের গদি নড়ে যাবে।

দেশের এই সংকটকালে গণতন্ত্র রক্ষায় ভয়-ভীতির উর্ধ্বে উঠে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশে সাংবাদিকদের অগ্রগণ্য সৈনিকের ভূমিকা পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে- গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহীতামূলক সরকার প্রতিষ্ঠা না হলে সাংবাদিকদের লেখার অধিকারও প্রতিষ্ঠা হবে না। গণতন্ত্র যেখানে দুর্বল, সেখানে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের গলা টিপে ধরা হবে। আর স্বাধীন সাংবাদিকতা না থাকলে সংবাদমাধ্যমও টিকবেনা। অস্তিত্ত্ব সংকটে পডবে পুরো সাংবাদিক সমাজ।

তাই অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে এখনই শ্লোগান উঠুক- মত প্রকাশের স্বাধীনতা- মুক্ত হোক। অগণতান্ত্রিক রুদ্ধতা- নিপাত যাক। সরকারের তল্পিবাহক পোষমানা দালাল সাংবাদিক চাই না। আমরা সত্যর মশাল হাতে জাতির বিবেক হিসেবে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা করতে চাই।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসেবে, চলতি বছরে শতাধিক সাংবাদিক নানাভাবে নির্যাতন, হামলা, হুমকি ও মামলার শিকার হয়েছেন।

নিরপরাধ সিনিয়র সাংবাদিক আবুল আসাদ সাহেব, রুহুল আমিন গাজীসহ অনেককেই জেলে পুরে রাখা হয়েছিল। সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলেরও একই পরিণতি মেনে নিতে হয়েছে। কাজলকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করারও সুজোগ দেয়া হচ্ছেনা। অথচ দুর্নীতিবাজরা বছরের পর বছর হাসপাতালে আয়েশি জীবন কাটাচ্ছে।

জবাবদিহিতা না থাকায় এ সরকার ও প্রশাসন ক্রমেই বেপরোয়া হযে উঠছে, রাজনৈতিক দূর্বৃত্ত্বদের লেলিয়ে দিয়ে গত বছরের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই চারটি ঘটনা ঘটিয়েছে।

ঢাকার ধামরাইয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে বেসরকারি টেলিভিশন বিজয় টিভির উপজেলা প্রতিনিধি জুলহাস উদ্দিনকে (৩৫) ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় দুই জনকে আটক করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ধামরাইয়ের গাঙ্গুটিয়া ইউনিয়নের বাড়বাড়িয়া এলাকায় এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

নাটোরে দ্য ডেইলি এশিয়ান এইজের নাটোর জেলা প্রতিনিধি সাংবাদিক মো. নাইমুর রহমানকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন মুখোশপরা দুই মোটরসাইকেল আরোহী। এ ঘটনায় গত শনিবার রাতে নাটোর থানায় জিডি করেছেন নাইমুর। নাইমুর জানান, গত ৪ সেপ্টেম্বর রাত ১০টায় শহরের ছায়াবানী মোড় থেকে ইজিবাইকযোগে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এনএস সরকারি কলেজ মসজিদের সামনে ইজিবাইক থেকে নামার পর এ ঘটনা ঘটে।

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাত ১২ টা ১৫ মিনিটের দিকে কক্সবাজার জেলা পরিষদের সামনে কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য ও সময় টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার সুজাউদ্দিন রুবেলকে শ্বাসরোধ করে হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে। পথচারীদের সহায়তায় প্রাণে রক্ষা পান এ সাংবাদিক।

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংসদ মহীউদ্দীন খান আলমগীরের ‘মানহানি’ করার অভিযোগে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানসহ পত্রিকাটির চার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে রোববার ৬ সেপ্টেম্বর চাঁদপুরের আদালতে মামলা হয়েছে।

অথচ, পুরো প্রমাণপত্রসহ গাজীপুরের সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নিয়ে গত ৩০ জুলাই ও ৪ সেপ্টম্বর দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রথম আলো, যার একটির শিরোনাম ছিল ‘একটি অনুমোদনহীন হাসপাতাল’ এবং অন্যটির শিরোনাম ‘অন্যের ঋণের টাকায় কেনা মহীউদ্দীনের হাসপাতাল’। চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আইনজীবী মো. হেলাল উদ্দিন বাদী হয়ে রোববার দণ্ডবিধির ৫০০/৫০১/৫০২ ও ৩৪ ধারায় এ মামলা করেন।

মানবাধিকার সংগঠনের হিসেবে গত ২৫ বছরে অর্ধশত সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেও অধিকাংশেরই সুষ্ঠু বিচার হয়নি। সাগর- রুনির হত্যাকাণ্ডের ৮ বছরেও ৭ বার তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ পিছিয়েছে।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি দেশকে ক্রমেই ঝুঁকিপূণ করে তুলছে। অথচ সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- “আইনের সুষ্ঠ ব্যবহার ও সঠিক আশ্রয় লাভ প্রত্যোক নাগরিকের অবিচ্ছেদ্দ্য অধিকার।”

লেখক: সাংবাদিক