আল-জাজিরার সম্প্রচার বন্ধের রিট ‘গ্রহণযোগ্য নয়’, বললেন ৫‘অ্যামিচি কিউরি’

February 17, 2021 3:23 am
Print Friendly, PDF & Email

বাংলাদেশে কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল-জাজিরার সম্প্রচার বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে করা রিট আবেদনটি গ্রহণযোগ্য কিনা, সে বিষয়ে ছয় অ্যামিচি কিউরির বক্তব্য শুনেছে হাই কোর্ট।

তাদের মধ্যে পাঁচ আইনজীবীর বক্তব্যের সারমর্ম হচ্ছে, ওই রিট আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। আর অন্যজন বলেছেন, আদালত চাইলে এ বিষয়ে আদেশ দিতে পারে।

বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লার ভার্চুয়াল হাই কোর্ট বেঞ্চ সোমবার এ বিষয়ে ছয় আইনজীবীর বক্তব্য শোনে।

ওই রিট আবেদনটি গ্রহণযোগ্য কিনা এবং আরজি অনুযায়ী আদালত একটি আন্তর্জাতিক টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধের নির্দেশ দিতে পারে কিনা, এ বিষয়ে অ্যামিচি কিউরি হিসেবে তাদের মতামত চেয়েছিল হাই কোর্ট।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী, ফিদা এম কামাল, কামাল উল আলম, প্রবীর নিয়োগী ও শাহদীন মালিক যে মত দিয়েছেন, তার মোদ্দা কথা হল ওই রিট আবেদন চলতে পারে না। অন্যদিকে আব্দুল মতিন খসরু ভিন্নমত দিয়েছেন।

পাঁচ আইনজীবী বলেছেন, ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার্স মেন’ শিরোনামে প্রচারিত তথ্যচিত্রটির বিষয়ে সরকারের ‘নিস্ক্রিয়তা’ আবেদনকারীকে কীভাবে সংক্ষুব্ধ করেছে এবং নির্বাহী বিভাগ প্রচলিত আইন অনুযায়ী এ বিষয়ে দায়িত্ব পালনে কোথায় ‘ব্যর্থ’ হয়েছে, রিট আবেদনে তা দেখাতে পারেননি আবেদনকারী।

তাছাড়া আবেদনকারী আদালতে আসার আগে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চেয়ে কোনো আবেদন (উকিল নোটিস) করেননি। প্রতিকার চেয়ে যদি তিনি তা না পেতেন, তাহলে রিট আবেদনটির গ্রহণযোগ্যতার একটি যৌক্তিক কারণ থাকতে পারত। কিন্তু এ আবেদনের ক্ষেত্রে তা বলা যাচ্ছে না।

ফলে রিট আবেদনকারীর সংক্ষুব্ধ হওয়ার ‘যৌক্তিকতা নেই’ এবং রিটটি ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে মনে করছেন পাঁচজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।

অপর অ্যামিকাস কিউরি আব্দুল মতিন খসরু রিট আবেদনটির গ্রহযোগ্যতার বিষয়ে মত না দিলেও বলেছেন, যেহেতু এ তথ্যচিত্রটি প্রচারের মাধ্যমে একটা ‘আঘাত’ এসেছে, আদালত চাইলে এ বিষয়ে আদেশ দিতে পারে।

তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে বিবাদীদের নিস্ক্রিয়তা রিট আবেদনকারীকে সংক্ষুব্ধ করেছে। তাছাড়া এ বিষয়ে আইনি প্রতিকার চাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে তার। সে কারণে তিনি আবেদনটি করেছেন।

ছয় আইনজীবীর বক্তব্য শোনার পর আদালত আগামী বুধবার রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা এ এম আমিন উদ্দিনের বক্তব্য শুনতে চেয়েছে। ওই দিনই রিট আবেদনটির গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নে আদেশ হতে পারে।

প্রেক্ষাপট
গত ১ ফেব্রুয়ারি রাতে ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রচার করে আল-জাজিরা।

এর প্রতিক্রিয়ায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে আল জাজিরার ওই প্রতিবেদনকে ‘মিথ্যা ও মানহানিকর’ হিসেবে বর্ণনা করে।

সেখানে বলা হয়, কিছু ‘উগ্রপন্থি ও তাদের সহযোগী, যারা লন্ডন এবং বিভিন্ন জায়গায় থেকে এসব করছে’, তাদের এই ‘বেপরোয়া অপপ্রচারকে’ বাংলাদেশ সরকার প্রত্যাখ্যান করছে।

আর সেনা সদরের তরফ থেকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পাঠানো এক বিবৃতিতে ওই প্রতিবেদনকে বর্ণনা করা হয় ‘সাজানো এবং দুরভিসন্ধিমূলক’ হিসেবে।

এরপর গত ৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে আল-জাজিরার সম্প্রচার বন্ধে নির্দেশনা চেয়ে হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এনামুল কবির ইমন।

আল-জাজিরায় সম্প্রচারিত ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ প্রতিবেদনটি ইউটিউব, ফেইসবুক ও টুইটার থেকে অপসারণের নির্দেশনাও চেয়েছেন তিনি।

গত বুধবার এ রিটের শুনানিতে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক মো. মজিবুর রহমান মিয়া বলেন, “সুনির্দিষ্ট আইন ও কর্তৃপক্ষ থাকার পরেও গত দশ দিনে কেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ওই ভিডিও অপসারণ করা গেল না? এখন তো দেশ ও বিদেশের কোটি কোটি লোক এটা প্রত্যক্ষ করেছে। এখন এটা বন্ধ বা অপসারণ করা না করা একই কথা।”

তিনি বলেন, “বিটিআরসি যদি এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে না পারে, তাহলে তারা ওখানে বসে আছে কেন?”

বিটিআরসির আইনজীবী রেজা-ই-রাকিব তখন বলেন, “আদালত আদেশ দিয়ে আল জাজিরার সম্প্রচার বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যাতে এ সংক্রান্ত ডকুমেন্টারি প্রচার না করা হয়, সেজন্য পদক্ষেপ নিতে আদালত আদেশ দিতে পারে, যেমনটা নোয়াখালীর এক নারীর নির্যাতনের ঘটনায় দেওয়া হয়েছিল। আর দেশের মধ্যে আল জাজিরার সম্প্রচার বন্ধ করা সম্ভব।”

এরপর আদালত আল-জাজিরার সম্প্রচার বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে করা রিট আবেদনটির গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নে আইনজীবীদের মতামত জানতে চায়। সে অনুযায়ী আদালতকে সহায়তাকারী এ ছয় আইনজীবী সোমবার তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন।

যা বললেন অ্যামিচি কিউরিরা

শুনানিতে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, বাংলাদেশে আল -জাজিরা প্রচার বন্ধ করা ‘উচিত হবে না’।

“আমাদের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও চিন্তার স্বাধীনতা দিয়েছে। সেই সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করা হয়েছে।”

আইনজীবী কামাল-উল আলম বলেন, এ বিষয়ে সংক্ষুব্ধ হয়ে রিট আবেদন করার মত ‘যৌক্তিক কোনো কারণ নেই’। তাছাড়া আবেদনকারী প্রতিকার চেয়ে না পেলে তার সংক্ষুব্ধ হওয়ার মত অন্তত একটি কারণ বলা যেত। কিন্তু তিনি তা করেননি। ফলে এ রিট আবেদনটি ‘চলে না’।

আইজীবী ফিদা এম কামাল বলেন, “সরকার এ তথ্যচিত্রটি প্রচার বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। অথবা নিয়েছে কিনা আমার জানা নাই। তাছাড়া আবেদনকারী যদি দেখাতে পারতেন যে জনস্বার্থ রক্ষায় নির্বাহী বিভাগের কোনো ব্যর্থতা রয়েছে, তবে তিনি প্রতিকার চাইতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। নির্বাহী বিভাগের ব্যর্থতা দেখিয়ে আবেদন করতে হবে।

“যদি তার মনে হত যে নির্বাহী বিভাগ যথাযথ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে, তবে তিনি জেলা প্রশাসক, পুলিশের মহাপরিদর্শক বা ডিজিটাল নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের কাছে অবিলম্বে তথ্যচিত্রটির প্রচার বন্ধ করতে বা সরিয়ে ফেলতে বিটিআরসির কাছে অনুরোধ জানাতে আবেদন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। যেখানে আবেদন করার কথা সেখানে আবেদন না করে সরাসরি তিনি উচ্চ আদালতে এসেছেন। এমনটা হতে পারে না।”

আইনজীবী প্রবীর নিয়োগী বলেন, “যদি এমন প্রশ্ন ওঠে যে, দেশে আল-জাজিরার সম্প্রচার বন্ধ করার এবং তথ্যচিত্রটি ও সে সম্পর্কিত বিষয়বস্তু ফেসবুক, ইউটিউব এবং টুইটারসহ সমস্ত সামাজিক মাধ্যম থেকে অপসারণের নির্দেশনা উচ্চ আদালত দেবে কিনা, তবে আমার জবাব হবে ‘না’।”

এ বিষয়ে আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলীসহ বেশিরভাগ আইনজীবী যে মত দিয়েছেন তার সাথে একমত পোষণ করেন আইনজীবী শাহদীন মালিক।

অন্যদিকে সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু বলেন, “এটা স্পষ্ট যে, বিবাদীদের ব্যর্থতার কারণেই রিট আবেদনকারী ব্যক্তিগতভাবে সংক্ষব্ধ হয়েছেন। তাছাড়া আদালতের এট বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ যে, সংবিধানের ৩১ ও ৪৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আবেদনকারী আইনি সুরক্ষা পাওয়ার ও মৌলিক অধিকার রক্ষার অধিকার রাখেন।”

তিনি বলেন, “আবেদনকারীর মৌলিক অধিকার ও সংবিধানের নীতিমালা সমুন্নত রাখতে আদালত তথ্যচিত্রটি ও এ সংক্রান্ত সংবাদ-প্রতিবেদন ডিজিটাল মাধ্যম থেকে মুছে ফেলতে বা সরিয়ে ফেলতে বিবাদীদের অনুরোধ করতে পারে অথবা আদেশ দিতে পারে। তা না করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকবে।”

(সুত্র-বিডিনিউজ)