ভারতে ধর্ষণ: প্রধান বিচারপতি শারদ বোবড়ের ধর্ষককে করা প্রশ্ন নিয়ে তোলপাড়; তার পদত্যাগের দাবি

March 5, 2021 1:02 am
Print Friendly, PDF & Email

ভারতে ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা দুটি মামলায় দেশটির সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর তার “অবিলম্বে পদত্যাগের” দাবি ক্রমশই জোরদার হচ্ছে।

প্রধান বিচারপতি শারদ বোবড়েকে লেখা একটি “খোলা চিঠিতে” পাঁচ হাজারের ওপর নারীবাদী, নারী অধিকার কর্মী এবং উদ্বিগ্ন নাগরিক তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন মি. বোবড়ের মন্তব্যে তারা “ক্রুদ্ধ” এবং তাকে তার বিবৃতি প্রত্যাহার করে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে এই চিঠিতে।

প্রধান বিচারপতি কী বলেছেন যা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে এই ব্যাপক ক্ষোভ এবং চলছে তোলপাড়?

তিনি দুটি “ন্যক্কারজনক” প্রশ্ন করেছেন।

প্রথমটি: “আপনি কি ওই মেয়েকে বিয়ে করবেন?”
তিনজন বিচারকের একটি বেঞ্চের প্রধান হিসাবে বিচারপতি মি. বোবড়ে ২৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তি যার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে, তাকে জিজ্ঞেস করেন, সে ধর্ষিতা মেয়েটিকে বিয়ে করবে কিনা?

“আপনি যদি ওই মেয়েকে বিয়ে করতে চান, আমরা আপনাকে সাহায্য করতে পারি। না চাইলে আপনি চাকরি হারাবেন এবং জেলে যাবেন,” তিনি বলেন।

তার এই মন্তব্য বহু মানুষকে স্তম্ভিত করেছে। বিশেষ করে অভিযোগকারী নারী, ২০১৪ থেকে ১৫ সালের মধ্যে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ষণের ঘটনার যেসব ভয়ঙ্কর অভিযোগ তিনি এনেছেন, সেসময় তার বয়স ছিল ১৬। অভিযুক্ত ব্যক্তি তার দূর সম্পর্কের আত্মীয়।

ওই চিঠির বয়ান অনুযায়ী, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ, সে ”মেয়েটির পিছু নিয়ে তাকে হয়রানি করে, তাকে বেঁধে রাখে, চিৎকার যাতে করতে না পারে তার জন্য মুখ বন্ধ করে রাখে, স্কুল শিক্ষার্থী অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েটিকে বারবার ধর্ষণ করে এবং তার গায়ে পেট্রল ঢেলে গায়ে আগুন দেবার ও তার ভাইকে খুন করার হুমকি দেয়”।

এতে আরও বলা হয় যে, ”ওই স্কুল শিক্ষার্থী আত্মহত্যার চেষ্টা করলে ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ পায়”।

মেয়েটির পরিবার আরও অভিযোগ করে যে, তারা পুলিশে খবর না দেবার ব্যাপারে সম্মতি দেয় কারণ অভিযুক্তের মা তাদের বলেছিল যে মেয়েটি প্রাপ্তবয়স্ক হবার পর ছেলেটির সাথে তারা মেয়েটির বিয়ে দেবে।

ভারতে ধর্ষণের ঘটনার জন্য প্রায়শই ধর্ষিতাকে দায়ী করা হয়ে থাকে এবং এধরনের যৌন নির্যাতনের ঘটনাকে একটা মেয়ের জন্য সারা জীবনের কলঙ্ক হিসাবে দেখা হয়। ফলে মেয়েটির পরিবার ছেলেটির মায়ের প্রস্তাবে রাজি হয়েছিল।

কিন্তু অভিযুক্ত পরে এই প্রতিশ্রুতি মানতে অস্বীকার করে আরেকজনকে বিয়ে করার পর ধর্ষণের শিকার মেয়েটি পুলিশের কাছে যায়।

অভিযুক্ত ব্যক্তি মহারাষ্ট্র রাজ্যে সরকারি কর্মচারী এবং তিনি গ্রেপ্তার হলে তার চাকরি হারাবেন এই মর্মে নিম্ন আদালতে আবেদন জানালে তাকে জামিন দেয়া হয়। কিন্তু বম্বে হাইকোর্ট এই নির্দেশকে “ন্যক্কারজনক” আখ্যা দিয়ে তার জামিন বাতিল করে দেয়।

ওই ব্যক্তি এরপর সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। সুপ্রিম কোর্ট সোমবার তাকে চার সপ্তাহের জন্য গ্রেপ্তার হওয়া থেকে সুরক্ষা দেবার বিষয়টি অনুমোদন করে এবং সেই শুনানির সময় ওই ব্যক্তির আইনজীবী ও বিচারপতি বোবড়ের মধ্যে এই ‘আলোড়ন সৃষ্টিকারী’ কথোপকথন হয়।
প্রতিক্রিয়া
খোলা চিঠিতে স্বাক্ষরদানকারী ভারতের প্রথম সারির নারীবাদী এবং বেসরকারি সংস্থাগুলো মি. বোবড়ের মন্তব্য বর্ণনা করার ক্ষেত্রে বম্বে হাইকোর্টে উচ্চারিত “ন্যক্কারজনক” শব্দটি ব্যবহার করেন।

“অপ্রাপ্তবয়স্ক একটি মেয়ের ধর্ষণের মামলা নিষ্পত্তিতে আপোষ হিসাবে আপনি বিয়ের যে প্রস্তাব দিয়েছেন তা ‘ন্যক্কারজনক’এরও অধম এবং ধর্ষকের শিকার একজনের ন্যায় বিচারের অধিকার এতে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।

অভিযুক্ত ধর্ষক যাকে ধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ তাকে বিয়ে করার এই প্রস্তাব দিয়ে আপনি ভারতের প্রধান বিচারপতি – আপনি মেয়েটিকে একজন নির্যাতনকারী, যে তাকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দিয়েছিল, তার হাতে সারাজীবন ধর্ষণের জন্য তুলে দিচ্ছেন,” লেখা হয় এই খোলা চিঠিতে।

দিল্লিতে একটি বাসে এক তরুণীকে নির্মম গণধর্ষণ ও পরে তার মৃত্যুর ঘটনার পর থেকে ভারতে ধর্ষণ ও যৌন অপরাধের বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে অলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে

ডিসেম্বর ২০১২ সালে দিল্লিতে একটি বাসে এক তরুণীকে নির্মম গণধর্ষণ ও পরে তার মৃত্যুর ঘটনার পর থেকে ভারতে ধর্ষণ ও যৌন অপরাধের বিষয়টি বিশেষভাবে অলোচনার কেন্দ্রে আসে, এ নিয়ে প্রতিবাদ চলে ভারত জুড়ে এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমেও ভারতে ধর্ষণের চিত্র শিরোনামে উঠে আসে।
এরপর থেকে ধর্ষণ নিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিচারক ও সমাজের শীর্ষ ব্যক্তিদের মন্তব্য, বক্তব্য অনেক তীক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করা শুরু হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির এই সাম্প্রতিক মন্তব্য নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে কারণ তার এই মন্তব্যকে দেখা হচ্ছে মামলায় দু পক্ষের মধ্যে “একটা আপোষ মীমাংসা করার প্রচেষ্টা” হিসাবে।

গ্রাম এলাকায় পরিবারগুলোর মধ্যে সমঝোতা বা মীমাংসা করার জন্য মুরুব্বিদের এধরনের আপোষরফার আলোচনা করার চল রয়েছে বহু বছর ধরে। আদালতকেও কোন কোন সময় ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত ও ধর্ষিতার মধ্যে বিয়ে দিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ মীমাংসা করতে দেখা গেছে।

কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট এবং নিম্ন আদালতেও এমন বেশ কিছু রায় এসেছে যেখানে বলা হয়েছে বিয়ের মাধ্যমে ধর্ষণ অভিযোগের কোন অবস্থাতেই নিষ্পত্তি করা যাবে না।

নারী অধিকার কর্মীরা বলছেন বিচারপতি বোবড়ে-র মন্তব্য “ধর্ষকদের এমন বার্তা দেবে যে বিয়ে ধর্ষণের ব্যাপারে একটা লাইসেন্স। একজন ধর্ষক অপরাধ করে পরে বিয়ে করার লাইসেন্স ব্যবহার করে অপরাধ থেকে আইনগতভাবে পার পেয়ে যেতে পারে”।

এই খোলা চিঠিতে দ্বিতীয় আরেকটি ধর্ষণের মামলার প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে যে মামলা বিচারপতি বোবড়ে একই দিনে শুনেছেন এবং সেখানেও বিতর্কিত দ্বিতীয় প্রশ্নটি করেছেন:

‘বিবাহিত দম্পতিদের মধ্যে যৌন মিলনকে ধর্ষণ হিসাবে বিবেচনা করা যায়?
দ্বিতীয় এই মামলাটি ছিল একজন পুরুষের আবেদনের শুনানি। তার নারী বন্ধু তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের যে অভিযোগ আনেন তা প্রত্যাখান করে ওই পুরুষ আদালতে আবেদন করেছিলেন। ওই নারীর সাথে দু বছর ওই পুরুষের সম্পর্ক ছিল যখন তারা একসাথে বসবাস করতেন।

আইনি একটি ওয়েবসাইট বার এ্যান্ড বেঞ্চ বলছে, ওই নারী অভিযোগ করেন যে তিনি “বিয়ের আগে কোনরকম যৌন সম্পর্ক প্রত্যাখান করার” পর ওই পুরুষ “প্রতারণার মাধ্যমে” তার অনুমতি জোগাড় করেন।

ওই নারী দাবি করেন ২০১৪ সালে তারা একটি মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করেন যখন ওই পুরুষের সাথে যৌন সম্পর্কে তিনি মত দেন।

কিন্তু ওই ব্যক্তি বলছেন তিনি তাকে বিয়ে করেননি এবং তিনি দাবি করেন তাদের মধ্যে যৌন সম্পর্কে ওই নারীর মত ছিল।

ওই পুরুষ আরেকজন নারীকে বিয়ে করার পর ওই নারী তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করেন।

সোমবার এই মামলার শুনানির সময় বিচারপতি বোবড়ে বলেন যে, “বিয়ের ব্যাপারে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়া অন্যায়” কিন্তু এরপর তিনি প্রশ্ন করেন, “যখন একজন পুরুষ ও নারী স্বামী স্ত্রীর মত একসাথে বসবাস করেন, তখন তার স্বামী নিষ্ঠুর চরিত্রের হতে পারেন, কিন্তু আইনত বিবাহিত দম্পতির মধ্যে যৌন মিলনকে কি ধর্ষণ বলা চলে?”

বিবাহিত সম্পর্কে ধর্ষণ
দীর্ঘ প্রচার প্রচারণার পর বিবাহিত সম্পর্কের মধ্যেও ধর্ষণকে স্বীকৃতি দেবার বিষয়ে জাতিসংঘের সুপারিশ সত্ত্বেও বিশ্বের যে তিন ডজন দেশ বিবাহিত সম্পর্কের ক্ষেত্রে যৌন অত্যাচারকে অপরাধ হিসাবে গণ্য করতে ব্যর্থ হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে ভারত।

নারীর অধিকার নিয়ে যারা কাজ করেন তারা বলছেন ভারতের মত একটা দেশ যেখানে নারীদের দমিয়ে রাখার মানসিকতার বিরুদ্ধে এবং বাইরে ও এমনকি পরিবারেও নারীর অধিকার আদায়ে নারীরা ক্রমাগত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সেখানে বিচারপতি বোবড়ের মন্তব্যগুলো “খুবই সমস্যার” ।

“এধরনের মন্তব্য একজন স্বামীর হাতে যৌন, শারীরিক ও মানসিক যে কোনরকম নির্যাতন ও সহিংসতাকে আইনি বৈধতা দেবে। ভারতীয় নারীরা যেখানে পরিবারের ভেতর তাদের ওপর চালানো নির্যাতন ও সহিংসতা বন্ধে আইনি ব্যবস্থা পেতে বছরের পর বছর ব্যর্থ হচ্ছেন সেখানে একজন বিচারপতি এধরনের মন্তব্য করলে সেটা মানুষ স্বাভাবিক বলেই ধরে নেবে।”

যারা এই খোলা চিঠিতে সই করেছেন তারা বলছেন প্রধান বিচারপতি শারদ বোবড়ের মন্তব্যকে হালকাভাবে নেবার কোন সুযোগ নেই। কারণ অন্যরাও তখন এটাকে আইনে ব্যবহৃত যুক্তি হিসাবে ভবিষ্যতে খাড়া করার চেষ্টা করবে।

(সুত্র-বিবিসি বাংলা)