কপ২৬ জলবায়ু সম্মেলন শুরু

October 31, 2021 11:43 pm
Print Friendly, PDF & Email

মোহাম্মদ জাকারিয়া,যুক্তরাজ্য:
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বিশ্বনেতাদের বলিষ্ঠ সিদ্ধান্তের প্রত্যাশায় স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে শুরু হয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত কপ২৬।

রোববার শুরু হওয়া এ জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সম্মেলনে প্রায় ২০০টি দেশের প্রতিনিধিরা ২০৩০ সালের মধ্যে তারা কীভাবে কার্বন নিঃসরণ কমাবেন এবং পৃথিবী নামক গ্রহকে সাহায্য করবেন, তার ঘোষণা দেবেন।

মানুষের জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কারণে কারণে নির্গত গ্রিন হাউস গ্যাসে বিশ্ব ক্রমশ উষ্ণ হয়ে উঠছে, সে কারণেই বিজ্ঞানীরা জলবায়ু সংক্রান্ত ভয়াবহ বিপর্যয়কর পরিস্থিতি এড়াতে দ্রুত পদক্ষেপ চাইছেন। না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে সতর্কও করেছেন তারা।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, এই সম্মেলন বিশ্বের জন্য “খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ‍মুহূর্ত।”

দু’সপ্তাহের এই সম্মেলনের প্রাক্কালে নেতাদেরকে তা সফল করার তাগিদ দিয়ে জনসন বলেছেন, “আমরা এ মুহূর্তকে কাজে লাগাতে পারব নাকি ফসকে যেতে দেব প্রত্যেকেই সে প্রশ্ন করছে।”

কপ২৬ সম্মেলনের প্রেসিডেন্ট অলোক শর্মা বলেছেন, পাঁচ বছর আগে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে আমরা যা অর্জন করেছিলাম এবার তেমন চুক্তিতে পৌঁছা কঠিন হবে। প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বের দেশগুলো তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করার লক্ষ্যমাত্রা নিতে একমত হয়েছিল।

কিন্তু বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এখন ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের পথে আছে, যা জলবায়ু বিপর্যয় ঘটাতে পারে, বলছে জাতিসংঘ।

বিবিসি ওয়ান এর এন্ড্রু মার শো তে অলোক শর্মা বলেন, “তাপমাত্রা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখাটা এখন নেতাদের ওপর নির্ভর করছে। তাদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন এবং তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখার ওই লক্ষ্য আমরা কীভাবে পূরণ করবে সে ব্যাপারে আমাদের একযোগে একমত হওয়া দরকার।”

“বিশ্বে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী চীনের মতো দেশগুলোর কাছ থেকে আমরা আরও বেশিকিছু আশা করি এবং এই জলবায়ু সম্মেলন এক্ষেত্রে তাদের জন্য নেতৃত্ব দেখানোর সত্যিকারের একটি সুযোগ সৃষ্টি করেছে।”

সম্মেলনের প্রথম দিনই বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) প্রকাশিত জলবায়ু পরিস্থিতি সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দেখা যাবে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিবিসি। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের তৈরি ডব্লিউএমও’র এ সাময়িক প্রতিবেদনে চলতি বছরের বৈশ্বিক তাপমাত্রার সঙ্গে আগের বছরগুলোর তাপমাত্রার তুলনা করা হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপদাহ, বন্যা ও দাবানলের মতো চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগগুলোর তীব্রতা বাড়ছে। গত দশক ছিল এখন পর্যন্ত নথিভুক্ত ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ দশক; পরিস্থিতি মোকাবেলায় দ্রুত সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়া যে প্রয়োজন, সে বিষয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকাররা একমতও হয়েছে।

জাতিসংঘের জলবায়ু সংক্রান্ত এ আয়োজন যুক্তরাজ্যে এখন পর্যন্ত হওয়া অন্যতম বড় সম্মেলন। সম্মেলনটি গত বছর হওয়ার কথা থাকলেও মহামারীর কারণে এক বছর পিছিয়ে যায়।

সম্মেলনে অংশ নিতে অনেক নেতাই গ্লাসগো গেছেন রোমে জি-২০ সম্মেলন শেষ করে। রোববার মূলত সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী। তাই খুব বেশি আলোচনা এদিন হবে না।

এদিন যারা বক্তৃতা দিচ্ছেন, তাদের মধ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বর্তমান সভাপতি ও মালদ্বীপের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল্লাহ শহীদের নামও আছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকায় তা মালদ্বীপের নিচু দ্বীপগুলোর জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।

গ্লাসগোর এই সম্মেলনে বিশ্বের সব দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন, তারা ২০৩০ সালের মধ্যে কতখানি কার্বন নিঃসরণ কমানো যায় তার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করবেন।

এ দেশগুলোর প্রতিনিধিরাই ২০১৫ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে ২ ডিগ্রির বেশি যেন উপরে না উঠে, তা নিশ্চিতে ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছিলেন।

কিন্তু চরমভাবাপন্ন আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ তীব্রতর হতে থাকায় জলবায়ু বিজ্ঞানীরা পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি এড়াতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে সর্বোচ্চ দেড় ডিগ্রি বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার তাগিদ দিয়েছেন।

রোমে অনুষ্ঠিত জি-২০র খসড়া ঘোষণায় জোটনেতারা তাপমাত্রা যেন প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে দেড় ডিগ্রির বেশি উপরে না উঠে, তা নিশ্চিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

কিন্ত ২০০৯ সালে বিশ্বনেতারা ২০২০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত গরিব দেশগুলোর জন্য করা জলবায়ু তহবিলে প্রতিবছর ১০০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা পূরণ হয়নি। প্রতিশ্রুতিটি পূরণ হতে ২০২৩ সাল লেগে যেতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

সম্মেলনে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন ডেভিড অ্যাটেনবরো ও গ্রেটা থুনবার্গের মতো সুপরিচিত পরিবেশকর্মীরাও। ‘ক্লাইমেট ট্রেনে’ চেপে শনিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় গ্লাসগোতে নামেন গ্রেটা; ট্রেন থেকে নামার পরপরই তার আশপাশে ভিড় জমে যায়।

চার্টার্ড এ ট্রেনটি অ্যামস্টারডাম থেকে রওনা হয়, এতে থাকা পাঁচশর মতো যাত্রীর মধ্যে ছিলেন নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, ইতালি ও জার্মানির প্রতিনিধিরা, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সদস্য ও দেড়শ তরুণ পরিবেশকর্মী।

বিমানের চেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব হওয়ায় এবারের গ্লাসগো সম্মেলনে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিনিধিদের অনেকেই ট্রেনকে বেছে নিয়েছেন।