জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলন কপ-২৬ : মানবতার জন্য টার্নিং পয়েন্ট

November 1, 2021 6:02 pm
Print Friendly, PDF & Email

মোহাম্মদ জাকারিয়া,যুক্তরাজ্য:
যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে শুরু হয়েছে জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলন কপ-২৬। এবারের এই জলবায়ু সম্মেলনকে মানবতার জন্য টার্নিং পয়েন্ট বলে অভিহিত করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন।

জলবায়ু বিষয়ে এবারের কপ-২৬ সম্মেলনটি সারাবিশ্বের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ এখানে ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তির অগ্রগতিসহ বিভিন্ন বিষয়ের পর্যালোচনা করা হবে। প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্ব নেতারা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রির নিচে অর্থাৎ ১ দশমিক ৫ ডিগ্রিতে ধরে রাখার চুক্তি করেছিল। এটাকে পৃথিবীর জন্য আদর্শ তাপমাত্রা বলা হচ্ছে।

এবারের সম্মেলনে সারা বিশ্ব থেকে ১২০ জন নেতা সরাসরি অংশ নেবেন, যা আগামী ১২ নভেম্বর শেষ হবে। কার্বন নির্গমন কীভাবে কমানো যায় সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন তারা।

দ্রুত বৈদ্যুতিক গাড়িতে চলে যাওয়া, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ থেকে দ্রুত সরে আসা, বৃক্ষনিধন কমানো, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব থেকে বেশিসংখ্যক মানুষকে রক্ষাসহ নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে এই সম্মেলন থেকে।

জলবায়ু বিষয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, এ শতাব্দীর শেষ দিকে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির হার ২ দশমিক ৭ ডিগ্রিতে পৌঁছাবে, যা লক্ষ্যমাত্রার থেকে দ্বিগুণ।

বৈশ্বিক জলবায়ুর লক্ষ্য অর্জন কতটা সম্ভব তা অনেকাংশে নির্ভর করে বিশ্বের সর্বোচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর কর্মকাণ্ডের ওপর। ২০৬০ সাল নাগাদ কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন শি জিনপিং, যা বিজ্ঞানীদের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যের চেয়ে ১০ বছর পিছিয়ে। ২০২৬ সালের মধ্যে কয়লার ব্যবহার বন্ধের ঘোষণাও দিয়েছে দেশটি।

কার্বন নিঃসরণে চীনের পরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। ট্রাম্পের বিদায়ের পর চলতি বছর আবারও জলবায়ু আলোচনায় ফিরেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্যারিস চুক্তিতে ফেরার পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ২০০৫ সালের তুলনায় ৫০ শতাংশ কমানোর ঘোষণা দেন বাইডেন। কিন্তু এ সংক্রান্ত সুস্পষ্ট নীতির অভাবে গ্লাসগো সম্মেলনে চীন, ভারত ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলোকে চাপে রাখার ক্ষেত্রে বড় বাধা বলে মনে করছেন কূটনৈতিক ও এনজিওকর্মীরা।

এবারের সম্মেলন নিয়ে ভীষণ আশাবাদী আয়োজক দেশ যুক্তরাজ্য। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে কয়লাকে ইতিহাসের পাতায় নিয়ে যাবেন বলে উল্লেখ করেছেন সম্মেলনের নেতা ব্রিটিশ মন্ত্রী অলোক শর্মা। ২০৫০ সালের মধ্যে নিট কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে যুক্তরাজ্য।

বিশ্বের আট ভাগ গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণের দায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ দেশের। তবে গত কয়েক বছর ধরেই তাদের নিঃসরণের মাত্রা পড়তির দিকে। ১৯৯০ সালের পর্যায়ের চেয়ে ২০৩০ সাল নাগাদ নিট নিঃসরণ অন্তত ৫৫ শতাংশে আর ২০৫০ সালে শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য তাদের। গত দুই বছর ধরেই তাপদাহ আর বন্যার মতো বৈরি জলবায়ুর মুখোমুখি হচ্ছে তারা।

উন্নত দেশগুলোর মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের ভুক্তভোগী মূলত বাংলাদেশসহ আফ্রিকা, এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের স্বল্পোন্নত দেশ ৪৬টি দেশ, যাদের ১০০ কোটি নাগরিক আছে। আফ্রিকান গ্রুপ অব ন্যাশনস, ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের সাথে মিলে এলডিসি দেশগুলোর লক্ষ্য থাকবে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে উন্নত দেশগুলোর বছরে ১০০ কোটি ডলারের জলবায়ু তহবিলের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় চাপ দেয়া।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০৫০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার এক কোটি ৩৩ লাখ মানুষ বাসস্থান হারাবেন। এই ধকল মোকাবিলায় কোপ-২৬ এ উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে তহবিলের প্রতিশ্রুতি আদায়ে আশাবাদী সরকার।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব জানাচ্ছে, বাংলাদেশে এখন প্রতিবছর চার লাখ মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসছেন স্থায়ীভাবে। এই সংখ্যা প্রতিদিন দুই হাজারের মতো। তাদের মধ্যে শতকরা ৭০ ভাগ জলবায়ু উদ্বাস্তু।